প্রকৃত আল্লাহর বান্দা কারা

আমল নামাজ

প্রকৃত আল্লাহর বান্দা যারা হবে তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ গুণ বিশেষ আচরণ পরিলক্ষিত হবে যার কারণেই তারা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা আসলে আমরা সকলেই তো আল্লাহর বান্দা তবে আমাদের চলাফেরা আচার-আচরণ ও ইবাদতের পার্থক্যের কারণে আমরা কিছুটা অন্যরকম। যারা প্রকৃত আল্লাহর বান্দা হবে তারা তো আল্লাহর সকল বিধি নিষেধ পালন করবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের বর্তমান যে অবস্থা আমরা অনেক সময়ই মুখে স্বীকার করি যে আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করি এক আল্লাহর বান্দা কিন্তু আমাদের আচার-আচরণে সেটি প্রকাশ পায় না কিছু গুণ তুলে ধরার চেষ্টা করব যে গুণগুলো আপনার মধ্যে থাকলে বা যে আমলগুলো আপনার মধ্যে পরিলক্ষিত হলে আপনি প্রকৃত আল্লাহর বান্দা সেটি প্রমাণিত হবে।

সর্বপ্রথম যে গুনটি প্রকৃত আল্লাহর বান্দার মধ্যে অবশ্যই থাকবে সেটি হল :- বিনয়ী হওয়া। যারা প্রকৃত আল্লাহর বান্দা হবে তারা বিনয়ী হবে তাদের মধ্যে বিনয়ী আচরণ প্রকাশ পাবে। আর এই বিনয়িতা তার সকল কিছুর ক্ষেত্রে প্রকাশ পাবে তার হাঁটাচলা তার আছার ব্যবহার তার কাজে-কর্মে সকল ক্ষেত্রে সেটি প্রকাশ পাবে। আমরা যে নবীর উম্মত হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেই সেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতই বিনয়ী ছিলেন যে তার জীবনের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম বর্ণনা করেছেন তিনি যখন চলাফেরা করতেন তখন যদিও তিনি সমতল ভূমিতে হাঁটতেন এমন অবস্থায়ও كانه ينحج من صبر তিনি এমনভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন যে মনে হতো কেমন জানি তিনি কোন উঁচু জায়গা থেকে নিচে গমন করছেন। তিনি এমনভাবেই চলাফেরা করতেন যে সব সময় কেমন যেন নিচের দিকে ঝুঁকে বিনয়ী মনোভাব নিয়ে চলতেন। বর্তমানে আমাদের কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে যদি আমি কোন অফিসের একটু বড় কর্মকর্তা হয় আমার অধীনে কিছু সংখ্যক মানুষ কাজ করে অথবা আমি যদি কোন ছোট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয় অথবা আমি ছাত্র বা যুবক কিন্তু আমার বাবার কিছু সম্পদ আছে তাহলে অনেক সময় আমাদের অনেকের মধ্যে একটা অহংকারের সৃষ্টি হয়।

একবার ভেবে দেখেন তো আমরা যে নবীর উম্মত আল্লাহ তাআলা তাকে নবী ও রাসুল বানিয়েছেন ঠিক ওই কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের বন্ধু হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন। আজ আমরা যদি কোন একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকের নিকটস্থ কেউ হয় বা আমি যদি কোন রাজনৈতিক নেতার নিকটতম বন্ধুও হয়ে থাকে তাহলেও আমার মধ্যে একটি অহংকার প্রকাশ পায় কিন্তু আমাদের নবী যিনি এক আল্লাহ যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন যিনি আমাদেরকে রিজিক দেন সে আল্লাহর নবী ও রাসূল এবং তার বন্ধু তবুও তার মধ্যে কোনরকম অহংকার কখনোই প্রকাশ পায়নি। প্রকৃত আল্লাহর বান্দা হতে গেলে শুধুমাত্র ইসলামের মৌলিক বিধান নামাজ রোজা হজ যাকাত এগুলো পালন করলেই হবে না। বরং আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে কোরআন অনুযায়ী স্বীকৃতি পেতে হলে আমাদের চলাফেরা আচার-আচরণ সকল কিছুর মধ্যে বিনয়ীতা প্রকাশ পেতে হবে।

প্রকৃত বিনয়ী কারা

আমরা যে যে পেশায় নিয়োজিত থাকি না কেন বা আমরা যেই হই না কেন আমাদের সকলের জন্য সর্বক্ষেত্রে বিনয়ী হওয়া অতীব প্রয়োজনীয়। আমরা বিনয়িতা প্রকাশ করি কিন্তু বাস্তবিক অর্থে যে সময় বিনয়িতা প্রকাশ করার দরকার সে সময় আমাদের মাঝে সেটা প্রকাশ পায় না। আমি আপনি আমরা যদি কোন অফিসে কর্মরত হই তাহলে আমি যদি আমার বসের সাথে সর্বদা বিনয়ী হয় তাহলে সেটা আসলে বিনয় তা নয় কারণ বসের সাথে যে বিনয়ী তা আমরা প্রকাশ করি তার মধ্যে কিছু কারণ থাকে সেটা হতে পারে আমার পারিবারিক কারণ আমার ক্যারিয়ারের কারণ আমার প্রমোশনের কারণ ইত্যাদি ব্যাপারে সেটি হয়ে থাকতে পারে। আবার আমি যদি স্টুডেন্ট হই তাহলে আমি আমার টিচার আমার বাবা-মা আমার রিলেটিভ এদের সাথে যদি বিনয়ী আচরণ করি তাহলেই যে আমি অনেক বিনয়ী এমনটা নয় কারণ তাদের কাছে আমরা বিনয়ী হব এটাই স্বাভাবিক তবে প্রকৃতপক্ষে বিনয়ী আমরা তখনই হতে পারব যখন আমি আমার অফিসের পিয়ন দারোয়ান এক কথায় আমার নিম্নস্তরে যারা জব করে এদের সাথে যখন আমি বিনয়ী আচরণ করতে পারব তখন আমি বিনয়ী বলে গণ্য হব।

পক্ষান্তরে আমি যদি স্টুডেন্ট হয় তাহলে আমার রিলেটিভ এবং আমার টিচার ইত্যাদি গুরুজন যারা রয়েছে তাদের সাথে শুধুমাত্র বিনয়ে আচরণ করলেই আমি বিনয় হতে পারব না। আমি প্রকৃত বিনয় তখন হব যখন আমি আমার চা স্টলের মামার সাথে, রিসকা ওয়ালা মামার সাথে, বাসের হেলপারের সাথে, এক কথায় এসব নিম্ন আয়ের মানুষ যারা রয়েছে যারা সমাজে একটু অবহেলিত এদের সাথেও যখন আমি বিনয়ী আচরণ করতে পারব প্রকৃতপক্ষে বিনয়ী আমি তখনই হব। আমরা সকলেই এ বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখার চেষ্টা করি। আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে স্বীকৃতি দিবেন তাদের দ্বিতীয় গুনটি হবে তাহাজ্জুতের নামাজ আদায় করা। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের মধ্যে বলেছেন والذين يبيتون لربهم سجدا وقياما আল্লাহর ওই সমস্ত বান্দা যারা আল্লাহ তালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য রাত্রিবেলা দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে নামাজ আদায় করে রুকু এবং সিজদা দেয়। এই রাত্রিকালীন ইবাদত অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজের এতই গুরুত্ব যে পৃথিবীতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এর পরে সকল নফল নামাজ এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো তাহাজ্জুদ নামাজ।

এর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নামাজ ফরজ ওয়াজিব এরপরে আর নেই। আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দা যারা করবে প্রকৃত আল্লাহ ওয়ালা ছিলেন তারা বলেছেন কেউ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে একান্ত সম্পর্ক করতে চাই, আল্লাহ তাআলার খুব নিকটবর্তী হতে চাই, আল্লাহ তায়ালার কাছে একান্ত কিছু চাইতে চাই, তাহলে তার জন্য তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে চাওয়া ছাড়া উত্তম ও বিকল্প কোন পথ নেই। এছাড়াও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন প্রত্যেক রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে অবস্থান করেন এবং বান্দাদেরকে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন তোমাদের মাঝে কি কেউ ক্ষম প্রার্থনাকারি আছো আমার কাছে ক্ষমা চাও তাহলে আমি তোমাকে মাফ করে দিব, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এমন আছো যে অসুস্থ আমার কাছে বল আমি তোমাকে আরোগ্য দিব সেফা দিব। অন্য সব সময় আল্লাহর কাছে চাওয়া এবং রাত্রির শেষ প্রহর যেটা আমরা ভোররাতো বলে থাকি সেই সময় চাওয়া এক নয় দুইটার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন তার নিজের জীবন থেকে অনেকে হয়তো করবেও শুনেছেন কোথাও তিনি বলেন এক ব্যক্তি আমার নিকট আসলো এবং বলল যে আমি খুবই বিপদগ্রস্ত এবং আমার আর কোন পথ নেই এমত অবস্থায় আমাকে কোন উপায় বলে দিন আমল বলে দিন তখন তিনি তাকে বলেন শেষ রাতে আল্লাহর নিকট তাহাজ্জুদ পড়ে দোয়া করতে এবং একান্তে আল্লাহ তাআলার কাছে সকল কিছু বলতে এর কিছুদিন পর উক্ত ব্যক্তি আবার তার সাথে দেখা করেন এবং বলেন যে তার সকল সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং এ সমস্যাগুলো যে এইভাবে সমাধান হবে তা সে কখনো ভাবতেও পারেনি। আপনি যদি কাউকে বলার মত না পান আপনার সমস্যাগুলো আপনার চাহিদা গুলো যদি পূরণের কোন মাধ্যম না থাকে যদি এমন অবস্থা হয় যে একদম দেয়াল এপিঠ ঠেকে গেছে তাহলে আপনি এই আমলটি করতে পারেন অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আপনার এ সকল সমস্যা থেকে আপনাকে মুক্ত করবেন ইনশাআল্লাহ।

কোরআনে কারীমের মধ্যেও আল্লাহ তা’আলা এই নফল নামাজের নির্দেশ আমাদের নবী কারীম এর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ومن الليل فتحجد به نافله لك রাতের কিছু অংশে নফল নামাজ হিসেবে আদায় কর। অতএব আমাদের এই আমলটি করা অতীব জরুরী এটি প্রায়ই আমাদের মধ্যে বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে আমরা সারারাত জাগরণ করে টেলিভিশন স্মার্টফোন দেখতে পারি কিন্তু কিছুক্ষণ সময় আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার জন্য আমাদের নিজেদের সকল চাওয়া পাওয়া গুলো আল্লাহর কাছে তুলে ধরার জন্য আমাদের উভয় জগতে কামিয়াবির জন্য এই ছোট্ট আমলটা করার জন্য কিছুটা সময় আমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে পারি না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। আমিন।