দোয়া কবুলের পাঁচটি শর্ত

দোয়া হালাল-হারাম

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেছেন এবং আল্লাহ তায়ালা জিন এবং মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এবং প্রত্যেকটি ইবাদতের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন প্রত্যাবর্ষকীয়। হালাল অপরজন ভক্ষণ করলে আমরা আল্লাহর কাছে যা চাইবো আল্লাহ তায়ালা খুব দ্রুতই সেটি দান করবেন এবং আমাদের দোয়াকে কবুল করবেন। আজ আমরা জানবো দোয়া কবুলের জন্য পাঁচটি শর্ত। এই পাঁচটি শর্ত যদি কারো মধ্যে পাওয়া যায় তাহলে মুহূর্তেই তার দোয়া কবুল হবে ইনশাআল্লাহ। প্রথম শর্ত: اكل الحلال হালাল খাওয়া, বর্তমান সময়ে আমরা এই বিষয়টি একেবারেই গুরুত্ব দেই না কিন্তু এটি সকল এবাদতের করবে প্রয়োজনীয়। আমরা কিছু কিছু মানুষ তো এমন আছি যে হালাল ও খায় হারাম খায় অর্থাৎ আমাদের মধ্যে এই দুইটাই পাওয়া যায় আবার কিছু আছে যারা শুধুমাত্র হারাম খায় এবং অল্প কিছু মানুষ হয়তো পাওয়া যাবে যারা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সর্বদাই চেষ্টা করি হালাল খাওয়ার জন্য।

আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন لا يدخل الجنه جسد قضي بالحرام হারাম ভক্ষণকারী শরীফ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আমরা আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাই আল্লাহর ইবাদত করি দোয়া করি কিন্তু আমাদের দোয়া কবুল হয় না আমরা এটা অনেকেই অভিযোগ করে থাকি যে আমার দোয়া কেন কবর হয় না। কিন্তু আমরা এটা লক্ষ্যই রাখি না বা অনেকে জানিই না যে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। উপার্জন হালাল হওয়ার জরুরী, আমি আপনি যেটা খাব সেটা হালাল হওয়া জরুরী, আমি আপনি যেটা পান করবো সেটা হালাল হওয়া জরুরী, আমি আপনি যেখানে বসবাস করব রাত্রি যাপন করব সেটি হালাল হওয়া জরুরি, এবং আমার আপনার ওই সম্পদ যেটি আমি গচ্ছিত রেখেছি সেটা ব্যাংকে হতে পারে বা অন্য কোন মাধ্যমে অন্য কোথাও হতে পারে যেভাবেই হোক না কেন যেখানেই হোক না কেন সেটি হালাল হতে হবে। এই সকল কিছু যদি আমরা ঠিক রাখতে পারি তাহলেই আমরা হালাল এর পথে আছি হালাল ভক্ষণ করতেছি আর এই কারণে দোয়া কবুলের একটি শর্ত আমার দ্বারা পূর্ণ হবে।

এবং আমি কেয়ামতের ময়দানে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবো। নবী আলাইহিস সালাম এর সময়ের একটি ঘটনা শুনলে হয়তো বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। একদিন এক সাহাবী কাবা শরীফের পাশে বসে আল্লাহর কাছে খুব কান্নাকাটি করছিল মাফ চাইতেছিল দোয়া করতে ছিল। তার এই আকুতি মিনতি কান্নাকাটি ও ইবাদত দেখে অন্য সাহাবারা ঈর্ষা বসত বলতে লাগলো আজকে সব সব এই সাহাবাই নিয়ে যাবে। সে এমনভাবে দোয়া করতে ছিল যে অন্য সাহাবারা এটা ধরেই নিয়েছিল যে আজকে এর দোয়া অবশ্যই কবুল হবে এবং এই ব্যক্তি আজ অনেক সওয়াবের অধিকারী হবে। তাদের এই কথোপকথন শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ওই ব্যক্তি যার কথা তোমরা আলোচনা করতেছো সে যা খায় হারাম খায়, এবং যা পান করে সেটাও হারাম, এবং সে যেই কাপড় পরিধান করে সেটিও হারাম উপার্জন থেকেই আসে, তাহলে কেমন করে আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করবেন…? ان الله طيب لا يحبل الا طيبا অর্থ আল্লাহ নিজে পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ছাড়া অপবিত্র কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। আরেকটি ছোট্ট ঘটনা বর্ণনা করি হযরত সাদ বিন আবি আক্কাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তিনি একবার আল্লাহর হাবিবকে বললেন ইয়া রাসূল আল্লাহ ادعوا الله ان يجعلني مستجاب الدعوه হে নবী আপনি তো দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা কবুল করেন আমার জন্য একটু দোয়া করেন যেন আল্লাহ তায়ালা আমাকে মুক্তাযাবুদ দাওয়াহ বানিয়ে দেন (মোস্তাজা বদ দাওয়া বলা হয় ঐ সকল ব্যক্তিদেরকে যাদের দোয়া করা মাত্রই কবুল হয়ে যায় অর্থাৎ দোয়া করতে দেরি কবুল হতে দেরি নয়) উত্তরে আল্লাহর রাসূল বললেন হে সাদ তুমি যেটা খাবে সেটি হালাল খাবে তাহলেই তুমি মোস্তাজাবুদ্ধাওয়া হয়ে যাবে।

সুবহানাল্লাহ! অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারলাম দোয়া কবুলের প্রথম শর্ত হলো হালাল পথে চলা হালাল খাবার ভক্ষণ করা অর্থাৎ হালাল এর উপরে থাকা। দোয়া কবুলের দ্বিতীয় শর্ত হলো: এক আল্লাহর কাছে চাওয়া এক আল্লাহর ওপরে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা। আমাদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ এমন আছে যারা আল্লাহর কাছে না চেয়ে বিভিন্ন মাজারে বিভিন্ন বাবার দরবারে চেয়ে থাকে আবার কিছু মানুষ এমনও আছে যারা মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কাছে চাই আবার বিভিন্ন মাজারে গিয়ে বাবার কাছেও চাই। আল্লাহ ছাড়া আমাদেরকে কোন মাজার বা কোন ব্যক্তি কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না হ্যাঁ আমরা মাজারে যাইতে পারি কিন্তু আমরা মাজারে গিয়ে কবরে জিয়ারত করব নিজের জন্য দোয়া করব এবং কবরে শায়িত ব্যক্তির জন্য দোয়া করব এবং যা চাওয়ার আল্লাহর কাছে চাইবো যদি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর কাছেই আমার সকল চাওয়া পাওয়া তুলে ধরতে পারি তাহলে আল্লাহতালা আমাদের দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ! দোয়া কবুলের তৃতীয় শর্ত হলো পূর্ণ ইয়াকীন থাকা বিশ্বাস থাকা। দোয়া করার সময় আমার আপনার মনের মধ্যে এটা থাকতে হবে যে আমার এই দোয়া আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই কবুল করবেন। আর আমার এই দোয়া আমার এই প্রত্যেকটি কথা আল্লাহতালা শুনছেন এবং আমি যা চাইতেছি তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই আমাকে দিতে পারেন এবং আমার রব আমার প্রতিপালক আমাকে কখনোই ফিরিয়ে দেবেন না।

এরকম বিশ্বাস মনের মধ্যে থাকতে হবে। আমরা মানুষ এমন যে মানুষ মানুষকে তো বিশ্বাস করি না আল্লাহকেও বিশ্বাস করতে পারি না আল্লাহর উপরও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারিনা যদি আমরা আল্লাহর উপর সঠিক বিশ্বাস স্থাপন করে একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর কাছে চাই তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ফিরিয়ে দেবেন না আমাদের দোয়া কবুল করবেন। ইনশাআল্লাহ! দোয়া কবুলের চতুর্থ নাম্বার শর্ত হলো: الصلاه على رسول الله আল্লাহর হাবিব এর উপর দরুদ পাঠ করা। এক হাদিসের মধ্যে বলা হয়েছে আমরা যে সকল দোয়া করি সকল দুআ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে যতক্ষণ না পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দরুদ পড়া হয়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যেমনি ভাবে পৃথিবীতে আমরা যখন আমাদের হাতের সেলফোন টা থেকে একজনকে মেসেজ করি কিন্তু ফোনে ব্যালেন্স থাকে না তখন সেই মেসেজটি যেমন পেন্ডিং হয়ে থাকে ঠিক তেমনি ভাবে যখন আমরা দোয়া করি কিন্তু দুরূদ শরীফ করি না সেই দোয়াটিও আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানে পেন্ডিং অবস্থায় থাকে এবং আমরা দুরুদ পড়ার সাথে সাথে সেটি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। দোয়া কবুলের পঞ্চম নম্বর শর্ত হলো: موافقه الدعاء بالدعوه অর্থাৎ শুধু দোয়া নয় দাউয়াও থাকতে হবে। বোঝার জন্য বলি অনেকে অনেক সময় এমন করে যে হুজুরের কাছে এসেছে একটি কলম নিয়ে তো তার কলমটা নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কি তার উদ্দেশ্য হল তার সন্তানের পরীক্ষা তো সেজন্য সেই কলমটি পড়ে নেবে যাতে তার সন্তানের পরীক্ষাটি ভালো হয়।

কিন্তু এমত অবস্থায় দোয়া তখনই কাজে দিবে যখন তার সন্তান পড়াশোনা করবে। দোয়াটা হলো একটি মাধ্যম কিন্তু আপনার মূলটা থাকা জরুরী কোন ব্যক্তি যদি অসুস্থ হয় তাহলে তার জন্য দোয়া অবশ্যই করতে হবে কিন্তু তার অসুস্থতা ছাড়ার জন্য অবশ্যই তাকে ঔষধ ও খেতে হবে এটাই ইসলামের নিয়ম। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে একটি বিচ্ছুতে কামড় দিলেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে বললেন গরম পানি দিতে অতঃপর গরম পানি দিতে লাগলেন এবং দোয়া পড়ে ফু দিতে লাগলেন দেখা গেল কিছুক্ষণ পরে যখন পানি দেওয়া অফ করা হলো পানি দেওয়া অফ করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা শেষ হয়ে গেল। এর থেকে বোঝা যায় যে শুধু দোয়া নয় দোয়ার সাথে কোন একটি মাধ্যমে প্রয়োজন। এই পাঁচটি শর্ত যদি আমরা পূরণ করতে পারি তাহলে আমরা যেই দোয়ায় করব আল্লাহ তাআলা আমাদের দোয়াকে কবুল করবেন। ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই সকল বিষয়গুলোর উপরে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন!