মহান আল্লাহ তাআলার একটি ফরজ বিধান হল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং নফল নামাজের মধ্যে সবথেকে অধিক মূল্যবান নামাজ হলো তাহাজ্জুতের নামাজ। যদিও আমাদের মধ্যে এটার বর্তমানে খুব একটা বেশি প্রচলন নেই তবে এটি একটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং ফরজ নামাজের পর যে নামাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল তাহাজ্জুতের নামাজ। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের মধ্যেও নাম ধরে আলাদা করে এই নামাজের কথা উল্লেখ করেছেন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন ومن الليل فتحجد به نافله لك পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ এবং আবশ্যিক নামাজ এর বাইরে ও রসূল আপনি রাতের কিছু অংশ দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করুন যেটাকে আমরা তাহাজ্জুদের নামাজ বলে থাকি। বান্দা আল্লাহ তায়ালার সবথেকে বেশি কাছাকাছি যেতে পারে এই সময়টা যেটাকে তাহাজ্জুতের সময় বা ভোররাতো বলা যায়। এবং তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে বান্দা তার প্রতিপালকের নিকট তার সকল চাওয়া পাওয়া তার দোয়াকে কবুল করে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে থাকে।
তাহাজ্জুতের সালাত যেহেতু এটি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মত আমরা নিয়মিত আদায় করি না বা এটার বিষয়ে সকলে সঠিক জ্ঞান ও রাখিনা তাই আমাদের মধ্যে এটির অনেক প্রশ্ন রয়েছে যেমন তাহাজ্জুদ এর সালাত কিভাবে আদায় করতে হয়..? এবং কখন আদায় করতে হয়..? সন্ধ্যা রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করলে তাহাজ্জুদ আদায় হবে কিনা…? ইত্যাদি প্রশ্ন আমাদের মধ্যে রয়েছে সে উদ্দেশ্যেই কিছু প্রশ্ন যেগুলো উত্তর দেওয়া খুবই জরুরী মনে করছি যেগুলোর উত্তর একেবারেই না দিলে নয় সেই উত্তরগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমরা যদি এই সালাতের নামের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে তাহাজ্জুদ যার অর্থ হল ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যে সালাত আদায় করা হয় তাকে তাহাজ্জুদ বলে। যদিও সন্ধ্যা রাতে অর্থাৎ এসার নামাজ আদায় এরপর যদি কেউ তাহাজ্জুদের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করে তাহলে সেটিকেও এক প্রকারের তাহাজ্জুদ বলা।
অর্থাৎ সেটি সাধারণত কিয়ামুল লাইন এর অন্তর্ভুক্ত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক্ষেত্রে দুইটি শব্দ ব্যবহার করেছেন একটি হলো কিয়ামুল লাইন অপরটি হল তাহাজ্জুদ। কিয়ামুল লাইল সাধারনত সন্ধ্যা রাত থেকে শুরু করে রাতের যে কোন অংশে পড়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রাতের যে অংশেই আপনি নামাজ পড়েন না কেন সেটি কিয়ামুল লাইন এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যদি কেউ রাতের প্রথম অংশে অর্থাৎ এশার পরপরই যারা দুই রাকাত অথবা দুই রাকাত দুই রাকাত করে চার রাকাত এইভাবে যদি নামাজ আদায় করে তাহলে সেটি কিয়ামুল লাইন এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এবং তিনিও রাতে সালাত আদায়কারীদের মধ্যে শামিল হলেন এবং সেটাও এক প্রকারের তাহাজ্জুদ নামাজ বলা যেতে পারে।
যদিও মূল তাহাজ্জুদ বা তাহাজ্জুদ শব্দের যে অর্থ সেটি বাস্তবায়িত হবে তখনই যখন সেটি ভোররাতে অর্থাৎ রাতের শেষ প্রহরে আদায় করা হবে একটু ঘুমিয়ে তারপরে উঠে আদায় করা হবে। যেহেতু তাহাজ্জত এর সঙ্গাই হল ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে রাতে সালাত আদায় করা। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারনত তাহাজ্জুদের নামাজ কখনই ছাড়তেন না। এবং বিভিন্ন ইমামগণ যাদেরকে আমরা অনুসরণ করি তাদের কথা মতে কোন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকটতম হতে চাই আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দা হতে চাই আর সে ভোর রাত্রে নামাজ আদায় করবে না তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করবে না দোয়া করবে না এটি কোশ্চেন কালেও হতে পারে না। কারণ আল্লাহ তায়ালার নিকটতম হওয়ার জন্য এটি একটি সর্ব উত্তম উপায়। আজকাল আমরা অনেকে তো বিষয়টি জানিনা যারা জানিও বিভিন্ন কারণে আদায় করতে পারি না আমরা যদি এখন চেষ্টা করি যে রাতের শেষ প্রহরে না পারলেও অন্ততপক্ষে রাত্রের প্রথম প্রহরের দিকে এশার নামাজের পরে অন্ততপক্ষে দুই রাকাত সালাত এই উদ্দেশ্যে আদায় করা। যাতে করে তাহাজ্জুদ যেহেতু কিয়ামুল লাইল এর অন্তর্ভুক্ত তাহলে সর্ব উত্তম শ্রেণীর তাহাজ্জত আদায় করতে না পারলেও সর্বনিম্ন শ্রেণীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবো।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত
আমরা অনেকেই প্রশ্ন করে থাকি যে তাহাজ্জুতের সালাতটাকি আমরা নফল নিয়তে আদায় করব না সুন্নত নিয়তে আদায় করব…? উত্তর হল আপনি যে কোন নিয়ত করলে আপনার সালাত আদায় হয়ে যাবে। মূলত আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু এটি নিয়মিত আদায় করতেন তাই এটাকে একটি সুন্নত নামাজও বলা যেতে পারে। আবার ফরজ সালাতের অতিরিক্ত হিসেবে যত সুন্নত আছে এগুলোকে এক ধরনের এক্সট্রা নামাজ বলা যায়। কিন্তু যেহেতু আমরা সাধারণত নফল বলতে বুঝি সুন্নতের ও বাইরে যেটা মানুষ একান্তই নিজের ইচ্ছাই আদায় করে সেটিকে। অতএব আমরা তাহাজ্জুতের নামাজটাকে সুন্নত নামাজ বলতে পারি যেহেতু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এটি পড়েছেন এবং আমাদেরকেও পড়ার জন্য আদেশ করেছেন সে দিক থেকে চিন্তা করলে এটি সুন্নত নামাজ বলা যায়। ফরজের বাইরে এক্সট্রা নামাজ হিসেবে এটাকে নফল নামাজ ও বলা যায়। তবে নফল বলার চেয়ে সুন্নত বলাটা আমাদের কাছে বুঝতে বেশি সহজ হয়। তবে নফল নামাজ নিয়ত করে এই নামাজটি আদায় করলেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম
তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার পদ্ধতি কি আমরা এটা নিয়ে অনেকেই অনেক বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছি আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছে যে মনে করে থাকে নির্দিষ্ট কোন সূরা পড়তে হয় দ্বিতীয় রাকাতে অমুক সূরা পড়তে হয় আবার কেউ এটাও মনে করে থাকে যে প্রত্যেক রাকাতে কিছু নির্দিষ্ট সূরা একের অধিক বার পড়তে হয় কিন্তু মূলত তাহাজ্জুদ নামাজ অন্য আর দশটি নামাজ যেভাবে আমরা পড়ে থাকি ঠিক সেভাবেই তাহাজ্জুদ নামাজ ও আদায় করতে হয়। তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। তবে হ্যাঁ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিস রয়েছে صلاة الليل مثنى مثنى অর্থাৎ রাত ও দিনের এই নফল নামাজ গুলো দুই রাকাত দুই রাকাত করে আদায় করতে হয়। এজন্য আমরা তাহাজ্জুতের সালাত দুই রাকাত দুই রাকাত করে আদায় করব এটাই উত্তম। তবে এই দুই রাকাত দুই রাকাত করে নামাজ পড়ার সময়ও আমরা এটা লক্ষ্য রাখবো যে তাহাজ্জুদ নামাজের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই অন্য নামাজ যেভাবে আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আদায় করে থাকি তাহাজ্জুদের নামাজের ও একই নিয়ম। এখানে একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা এটা বলে থাকে যে প্রথম রাকাতে এই সূরা এতবার দ্বিতীয় আঘাতে অমক সূরা এতবার এটি আসলে সঠিক নয়।
তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোন সূরাও নেই এবং নির্দিষ্ট কোন সংখ্যাও নেই। তবে হ্যাঁ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাজে অধিক সময় ব্যয় করতেন আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাহাজ্জুতের নামাজে অধিক দৈর্ঘ্য তা এবং অধিক সুন্দরতা প্রকাশ পেত। এর অর্থ হল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদ নামাজ অত্যাধিক সুন্দর করে এবং অধিক সময় ধরে আদায় করতেন তাই আমরাও চেষ্টা করব আমাদের যে সূরা গুলো মুখস্ত আছে তার মধ্যে সবথেকে বড় সূরাটি পড়ার জন্য যদি আমার অন্য কোন সমস্যা না থাকে। এছাড়াও শুধু সুরা কেরাত এর ক্ষেত্রে নয় বরং রুকু সেজদাতেও আমরা অধিক সময় ব্যয় করতে পারি সে ক্ষেত্রে তিনবার পাঁচবার সাতবার এই নির্দিষ্ট প্রাণী পরিমাণে কোন তাসবিহ পড়তে হবে এটা ধর্তব্য নয় আপনি অধিক পরিমাণে তাজবি পড়তে পারেন আর এই তাসবিহ পড়ার ক্ষেত্রে অনেকে বলে থাকেন জোর-বিজোড় এটাও কোন জরুরী বিষয় নয় আপনি ইচ্ছামত করতে পারেন যেহেতু আপনি অধিক বার পাঠ করছেন।
এবং সিজদার মধ্যে আপনি আপনার চাওয়া গুলো আপনার মনের ইচ্ছাগুলো আল্লাহর কাছে তুলে ধরতে পারেন এমন নয় যে শুধুমাত্র নামাজ শেষ করে আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করে চাইবেন এটাই একমাত্র নিয়ম এমনটা নয় আপনি সিজদার মধ্যেও আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন। এটাই মূলত তাহাজ্জুতের নিয়ম তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা কোন নিয়ম নেই। এবং কোন নির্দিষ্ট সুরা কেরাত ও নেই। এবং তাহাজ্জুতের নামাজ সর্বনিম্ন দুই রাকাত এবং সর্বোচ্চ আট রাকাত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম পড়েছেন বলে আমরা জানতে পারি। অতএব তাহাজ্জুদের নামাজের রাকাত সংখ্যা বৃদ্ধি করার থেকে নামাজের সময়ের আধিক্যটা বাড়ানোর দিকে লক্ষ্য দেওয়াটা আমাদের জন্য বেশি লাভনীয় হবে। সর্বশেষ তাহাজ্জুদ মূলত সুন্নত নামাজ আমরা সুন্নত নামাজ হিসেবে আদায় করার চেষ্টা করব তবে যদি নফল নামাজের নিয়ত করি তবুও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় হয়ে যাবে। তাহাজ্জুদ মূলত ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে পড়তে হয়। তবে যদি কেউ শেষ করে উঠতে পারবেনা বা কোন কারণবশত প্রথম রাত্রে দিকে অর্থাৎ এশার পরে আদায় করার উদ্দেশ্য করে তাহলে সেটিও আদায় হবে। তবে শেষ রাত্রে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করাটা সবথেকে বেশি উত্তম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার তৌফিক দিন। আমিন